কুইক লিঙ্ক : মুজিব বর্ষ | করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব | প্রিয় স্টোর

গুলিস্তানের সড়কে বিভিন্ন পণ্যের কেনাবেচা চলছে

কোথাও স্বাস্থ্যবিধির বালাই নেই

তানজিল রিমন
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৮ জুলাই ২০২১, ১৭:৫৫
আপডেট: ১৮ জুলাই ২০২১, ১৭:৫৫

রাজধানীর ফার্মগেট। শনিবার রাত সাড়ে ৭টা। ফুটপাতে বিভিন্ন পণ্যের পসরা সাজিয়েছেন হকাররা। তাদের ঘিরে ছোট ছোট জটলা। হকারের পণ্যের চারপাশ ঘিরে ক্রেতারা দেখছেন বিভিন্ন পণ্য। কোথাও জুতা, কোথাও টি-শার্ট বা শার্ট। অনেকেই পছন্দের পণ্য কিনছেন। আবার কেউ কেউ দেখছেন। গায়ে গা ঘেঁষে, একজনের মাথার ওপর দিয়ে আরেকজন পণ্য দেখার চেষ্টা করছেন। ভিড়ের কারণে ভেতরের পণ্য দেখার সুযোগ না থাকলেও কেউ কেউ দুজনের মাঝখানে হাত ও কাঁধ বাড়িয়ে দিয়ে নিজের জায়গা করে নিচ্ছেন। তাদের অধিকাংশের মুখে মাস্ক নেই। কারো কারো থাকলেও তা থুতনিতে। মানা হচ্ছে না স্বাস্থ্যবিধি।

একই চিত্র দেখা গেছে নিউমার্কেট, মিরপুর ১ নম্বর, মোহাম্মদপুরের কৃষি মার্কেট, কারওয়ান বাজারের ফুটপাতে বসা বিভিন্ন দোকানগুলোয়। পাশাপাশি বিভিন্ন মার্কেট ও শপিং মল, গণপরিবহন, পশুর হাটসহ সব জায়গায়ই অধিকাংশ মানুষকে মাস্ক ছাড়া চলাফেরা ও কেনাবেচা করতে দেখা গেছে। ঢাকার বাইরে এই অবস্থা আরও নাজুক।

করোনা নিয়ন্ত্রণে জুলাইয়ের ১ তারিখ থেকে ‘কঠোর’ বিধিনিষেধ আরোপ করে সরকার। কিন্তু এতেও সংক্রমণ বা মৃত্যু কোনোটাই নিয়ন্ত্রণে আসেনি। বরং তা ঊর্ধ্বমুখী। ইতোমধ্যে সংক্রমণ বৃদ্ধি ও মৃত্যুতে শীর্ষ ১০ দেশের মধ্যে ঢুকে গেছে বাংলাদেশ। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই ১৫ জুলাই থেকে ২২ জুলাই পর্যন্ত বিধিনিষেধ শিথিল করে দেওয়া হয়। কিন্তু স্বাস্থ্যবিধি মানার শর্ত জুড়ে দিলেও কোথাও স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে না।

ঈদুল আযহাকে সামনে রেখে বিধিনিষেধ শিথিল করলে সবকিছুই পূর্বের অবস্থায় ফিরে যায়। রাজধানীর শপিংমল, বিভিন্ন দোকান খোলা হয় এবং ঈদ যত কাছে আসছে, দোকানগুলোতে ভিড়ও বাড়ছে। ক্রেতা-বিক্রেতাদের অধিকাংশের মুখে মাস্ক নেই। সবাই কেনাবেচায় ব্যস্ত। কার মুখে মাস্ক আছে আর কে হাঁচি দিচ্ছে, তা দেখার ফুসরত নেই কারো। যেখানে মাস্ক পরছে না, যত্রতত্র হাঁচি-কাশি দিচ্ছে, সেখানে শারীরিক দূরত্ব মানার কোনো প্রশ্নই নেই!

টিসিবির পণ্য কিনতে ভিড় করেছেন অনেকে। ছবিটি রামপুরা থেকে তোলা

অন্যদিকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে গাড়ি চালানোর অনুমতি দেওয়া হলেও রাজধানীর বিভিন্ন পরিবহনে তা মানছে না। অর্ধেক আসন ফাঁকা রাখার কথা থাকলেও যাত্রী নেওয়া হচ্ছে দাঁড় করিয়ে। মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডে রজনীগন্ধা পরিবহনের একটি বাসকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। অথচ বাসের ভেতরে আটজন যাত্রী দাঁড়িয়ে রয়েছে। দুই একটি সিটে যাত্রীরা পাশাপাশি বসেছেন।

জসিম উদ্দিন নামের এক যাত্রী বলেন, ‘আপনাকে ভাড়া দিতে হবে দ্বিগুণ। আবার ঘাড়ের ওপর যাত্রী তুলে নেবে।’ পাশেই দাঁড়ানো যাত্রীকে দেখিয়ে তিনি বলেন, ‘দ্যাখেন, মুখে যদি মাস্ক থাকত, তবুও বিষয়টি মানা যেত।’

বাড়ির পথে শত শত মানুষ। ছবিটি সদরঘাট থেকে তোলা

ওই বাসের যাত্রীদের অনেকের মুখেই মাস্ক নেই। কেউ আবার থুতনিতে ঝুলিয়ে রেখেছেন। বাসের চালক রহমান বলেন, ‘ভাই, গরমে কতক্ষণ মাস্ক পরে থাকন যায় কন।’ বাসের ভেতর দাঁড় করিয়ে যাত্রী নিয়েছেন কেন-প্রশ্ন করতেই বাস ছেড়ে দিয়ে তিনি বলেন, ‘যাত্রীরা উঠলে আমগো কি করার আছে।’

মিডলাইন, মালঞ্চ পরিবহনের কয়েকটি বাসেও এই চিত্র দেখা গেছে। 

ঈদের আগে বাড়ি যাওয়ার জন্য রাজধানীর গাবতলী, মহাখালী ও সায়েদাবাদ আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল এবং সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে মানুষ ভিড় করছে। দূরপাল্লার বাসগুলো যথাসময়ে না পৌঁছায় অনেককেই টার্মিনালে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। গরমের মধ্যে অপেক্ষারত যাত্রীদের বেশিরভাগের মুখেই মাস্ক নেই। শনিবার ঠাকুরগাঁও যাওয়ার জন্য রাজধানীর একটি বেসরকারি স্কুলের শিক্ষক রেজওয়ানুল হক তার স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন গাবতলীতে। নাবিল পরিবহনের বাসটি দুপুরেও পৌঁছায়নি। তিনি বলেন, ‘এই গরমের মধ্যে কতক্ষণ থাকা যায় বলেন। আর বসার যেটুকু জায়গা রয়েছে, সেখানে ২০ জনের জায়গায় রয়েছে ৫০ জনের ওপরে। আশপাশে কোথাও খালি জায়গা-ও নেই যে, গিয়ে একটু বসব। দেখেন না, বেশিরভাগ মানুষের মুখে মাস্ক নেই।’

ঢাকার বাইরের শপিং মল ও পশুর হাটে স্বাস্থ্যবিধি মানছে না কেউই। ঠাকুরগাঁও সদরের খোচাবাড়ির হাট থেকে তোলা ছবি

গরু-ছাগলের হাটগুলোর ক্ষেত্রে যেসব নির্দেশনা রয়েছে, সেসবও মানা হচ্ছে না। ঢাকার বাইরে থেকে গরু-ছাগল নিয়ে আসা ব্যবসায়ীদের মধ্যে মাস্ক ব্যবহারের প্রবণতা কম। ক্রেতাদেরও অনেকের মুখে মাস্ক নেই। ভিড়ও লক্ষ্য করার মতো। 

শেরপুর, ফেনী, চট্টগ্রাম ও ঠাকুরগাঁও জেলার স্থানীয় কয়েকজন জানিয়েছেন, সেখানকার কোনো হাটে স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে না। খোলা জায়গায় গরু-ছাগলের হাট বসলেও ক্রেতা-বিক্রেতাদের ভিড় প্রচুর। শারীরিক দূরত্ব মানার কোনো সুযোগ নেই। বেশিরভাগ মানুষই মাস্ক পরছে না। একই অবস্থা স্থানীয় বাজার, দোকানগুলোতেও। যে যার মতো ঘুরছে-ফিরছে, কেনাকাটা করছে।

যদিও আজ রবিবার পশুর হাটগুলোতে স্বাস্থ্যবিধি না মানায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এক ভার্চুয়াল বুলেটিনে অধিদপ্তরের মুখপাত্র অধ্যাপক ডা. নাজমুল ইসলাম বলেন, ‘জনস্বাস্থ্যের বিষয়টি সিভিল সার্জনসহ সবাইকে অনুসরণ করার জন্য পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পশুর হাটগুলো স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দেখভাল করা হয়, তারাও নজরদারিতে রেখেছেন।’

ক্রেতা ও বিক্রেতাদের সচেতনতার প্রতি গুরুত্বারোপ করেন তিনি।